তেলযুদ্ধে ওপেক-যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় শীর্ষ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জোট Organization of the Petroleum Exporting Countries (OPEC)+ । ৫ অক্টোবর ২০২২ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় জোটের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তেলের বাজারে নিজেদের আধিপত্য ও দাম ধরে রাখতে সংগঠনটি এমন সিদ্ধান্ত নেয়।
তেল সংকটের সূত্রপাত
১৭ অক্টোবর ১৯৭৩ বিশ্বে প্রথম তেল সংকটের সূচনা হয়। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন OPEC আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থনদানকারী দেশে তেল সরবরাহ করবে না বলে ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাপী তেল রপ্তানিতে এটিই প্রথম ধাক্কা। এর ফলে বিশ্বে তেলের দাম বেড়ে যায় চারশো গুণ। এই নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল ১৯৭৪ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত।
সংঘাত: তেল নিয়ে বিভিন্ন দেশে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ-১৯৫৩ সাল: যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মিলে ইরানে অভ্যুত্থান • ২ আগস্ট ১৯৯০: প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে কুয়েতকে সহায়তা • ২০ মার্চ ২০০৩: যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক যুদ্ধ • ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১: জাতিসংঘের যোগসাজশে ন্যাটো বাহিনীর লিবিয়া আক্রমণ; বর্তমানে ৯ বছরের গৃহযুদ্ধে লিবিয়া কার্যত চার ভাগে বিভক্ত • ২০১১ সাল থেকে চলমান সিরিয়ায় অস্থিরতাও তেলের সম্পর্ক রয়েছে।
OPEC ও OPEC+ গঠন
১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ ইরাকের রাজধানী বাগদাদে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে Organization of the Petroleum Exporting Countries (OPEC)। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদার ৪৪% OPEC জোগান দেয়। এটির বর্তমান সদস্য দেশ ইরাক, ইরান, আলজেরিয়া, লিবিয়া, কুয়েত সৌদি আরব, আরব আমিরাত, নাইজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা, গিনি, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, গ্যাবন ও অ্যাঙ্গোলা। ২০১৯ সালে তেলের বাজারে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ খ্যাত OPEC-এর সাথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে এমন OPEC বহির্ভূত ১০ দেশ নিয়ে OPEC+ গঠিত হয়। OPEC+ দেশগুলো আজারবাইজান, বাহরাইন, ব্রুনাই, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া মেক্সিকো, ওমান, রাশিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং সুদান।
যুক্তরাষ্ট্র-ওপেক দ্বন্দ্ব
বিশ্বে মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশের জোগান দেয় রাশিয়া। ইউক্রেনে হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত OPEC+ জোটের বৈঠকে তেলের উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্তে কোনো দেশেরই মতবিরোধ নাই। এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মাত্র ৩০ মিনিটে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ২% হ্রাস পায় যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ক্রমশ বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ৮ নভেম্বর ২০২২ যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে OPEC+ -এর এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে বাইডেন প্রশাসন এবং ডেমোক্র্যাট দলকে কিছুটা বিপাকে ফেলে দেয়। সৌদি আরব OPEC কে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে দাবি করে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের অঙ্গীকার করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। OPEC+ জানায় বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সেই বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত। এরই ফলশ্রুতিতে সৌদি আরব ও এ ইস্যুতে দেশটিকে সমর্থনকারী সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল উত্থাপন করেন তিন মার্কিন আইনপ্রণেতা।
তেল নিয়ে দৌড়ঝাপ
১৫ জুলাই, ২০২২ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠক করে তেল উৎপাদন বাড়ানোর অনুরোধ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। অন্যদিকে ২৯ জুলাই, ২০২২ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে আলোচনায় মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে তেল উৎপাদন বৃদ্ধির আবেদন করেন। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ সৌদি সফরে গিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলজ তেল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানান। এর আগে ৬ মার্চ, ২০২২ রাশিয়ার তেলের ওপর চাপ কমাতে ভেনিজুয়েলা যান মার্কিন কর্মকর্তারা। তাছাড়া তেল সংকট কাটাতে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে তেলের মূল্য কমাতে ১৯ অক্টোবর, ২০২২ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো-বাইডেন রিজার্ভ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহের ঘোষণা দেন।
তেল উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি ও রিজার্ভে শীর্ষ ১০ দেশ
উৎপাদন | আমদানি | রপ্তানি | রিজার্ভ |
যুক্তরাষ্ট্র | চীন | সৌদি আরব | ভেনিজুয়েলা |
সৌদি আরব | যুক্তরাষ্ট্র | রাশিয়া | সৌদি আরব |
রাশিয়া | ভারত | কানাডা | ইরান |
কানাডা | দ. কোরিয়া | ইরাক | কানাডা |
ইরাক | জাপান | আরব আমিরাত | ইরাক |
চীন | জার্মানি | যুক্তরাষ্ট্র | কুয়েত |
আরব আমিরাত | নেদারল্যান্ডস | নরওয়ে | আরব আমিরাত |
ইরান | ইতালি | কুয়েত | রাশিয়া |
ব্রাজিল | স্পেন | নাইজেরিয়া | লিবিয়া |
কুয়েত | থাইল্যান্ড | ব্রাজিল | যুক্তরাষ্ট্র |
মন্দার মুখে বৈশ্বিক অর্থনীতি
করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় গতি হারায় পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্বে কি মন্দা আসন্ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির তিন মূল চালিকাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপের অর্থনীতি দ্রুত গতি হারাচ্ছে। ফলে আগামী বছরে সামান্য আঘাতেও মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ১৯৮০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত ৯ বার মন্দার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এর মধ্যে মাত্র পাঁচবার মন্দা দেখা গেছে।
মন্দা কী?
মন্দার কোনো স্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। অর্থনীতির ভাষায় সাধারণত একটি অর্থবছরের পরপর দুইটি প্রান্তিকে কোনো দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে যদি নিম্নমুখী বা ঋণাত্মক ধারা অব্যাহত থাকে তবে তাকে মন্দা বলা হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে অর্থনীতির বিকাশ যখন ৩ শতাংশের কম হয় তখন সেই পরিস্থিতিকে বিশ্বব্যাপী মন্দা বলা যায়। তাদের হিসাবে আনুমানিক ৮-১০ বছর পরপর চক্রকারে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দেয়।
ইতিহাস
আধুনিক অর্থব্যবস্থায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্রথম মন্দা দেখা দেয়। আবার বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এর ব্যাপ্তি ছিল ১৯২৯-১৯৩৯ সাল পর্যন্ত। ১৯২৯ সালে অক্টোবরে মাত্র দুই দিনে ধ্বংস হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার। কয়েক দিনের মধ্যে শিল্প কলকারখানায় উৎপাদনে ধস নামে। মাত্র এক বছরের মাথায় বেকার হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের এক কোটি মানুষ। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ১৯৯৭ সালে বিদেশি মুদ্রার অভাবে এশিয়ার বাজারে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এ সময় থাইল্যান্ড থেকে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে থাকেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। থাইল্যান্ড থেকে শুরু হওয়া এ অর্থ সংকট দ্রুত পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়লে দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গৃহায়ণ খাতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। দেশটির বন্ধকি বাজারের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণব্যবস্থা ও আর্থিক খাতের শিথিল নিয়ন্ত্রণই মন্দার শুরুটা করেছিল।
বাংলাদেশের করণীয় ও চ্যালেঞ্জ
আসন্ন মন্দার ঝুঁকি এড়াতে ভোগ কমানোর চেয়ে বরং উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত । একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। মন্দায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে তার সাথে দেশের বাজারের সমন্বয় সাধন করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। এগুলো হলো- রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে, আমদানি করা খাদ্য পণ্যের দাম বাড়বে ও রেমিট্যান্স কমতে পারে।