আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি

কালানুক্রমিক ঘটনাবলি

০২.০৫, ২০২২

♦ তিনদিনের সফরে ইউরোপ যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

♦ মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ব্রায়ান হিগিন্স বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

০৪.০৫.২০২২

♦ ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ান তেল ক্রয় পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার প্রস্তাব করে।

০৬.০৫.২০২২।

♦ চীনে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এশিয়ান গেমসের ১৯তম আসর স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।

♦ ইউক্রেনের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা নিয়ে রাশিয়াসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

০৭.০৫.২০২২

♦ বিক্ষোভ দমনে শ্রীলংকায় জরুরি অবস্থা জারি।

♦ আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা ও তালেবান প্রধান হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা দেশটির নারীদের ঘরের বাইরে মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত ঢেকে থাকা বোরকা পরার নির্দেশ দেন।

০৮.০৫,২০২২

♦ হংকংয়ের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন জন লি কা-চিউ।

০৯.০৫.২০২২

♦ ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত।

♦ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের গুমসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের পাঁচ দিনব্যাপী ১২৭তম বৈঠক সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু।

♦ সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে।

♦ ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে Lend-Lease আইনে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

১০.০৫.২০২২

♦ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ইউন সুক-ইওল।

♦ iPod তৈরি বন্ধের ঘোষণার মাধ্যমে iPod যুগের অবসান ঘটায় অ্যাপল।

১১.০৫.২০২২

♦ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি মধ্যরাতে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের মছিলিপত্তনম ও নারসাপুরমের মধ্যবর্তী স্থানে উপকূলে আঘাত হানে।

♦ ফিলিস্তিনের দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ নিহত।

♦ রাশিয়া থেকে ইউক্রেনের সোখরনিভকার ওপর দিয়ে যাওয়া ইউরোপের জন্য সরবরাহকৃত গ্যাস লাইন বন্ধ করে দেয় ইউক্রেন।

১২.০৫,২০২২

♦ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা UNHRC রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের প্রস্তাব পাস করে।

♦ শ্রীলংকার সদ্য পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, তার ছেলে নামাল রাজাপাকসেসহ ১৫ সহযোগীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন দেশটির আদালত। -শ্রীলংকার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন রনিল বিক্রমাসিংহে।

১৩.০৫.২০২২

♦ বিশ্বের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড গড়েছেন নেপালী নারী    লাকপা শেরপা (১০ বার)।

♦ শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে।

♦ দক্ষিণ চীন সাগরের তীরবর্তী দেশগুলো হল- চীন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া।

১৪.০৫.২০২২

♦ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের স্থলাভিষিক্ত হলেন মোহাম্মাদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।

♦ ইরপিন নদী ইউক্রেনের কিয়েভে রুশ আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করেছে।

♦ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের পাশে থাকার কথা বলেছে ভারত।

১৫.০৫.২০২২

♦ সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিতে আগ্রহী।

♦ দনবাস ও খারকিভ শহর দুইটা ইউক্রেনে অবস্থিত।

♦ সংযুক্ত আরব আমিরাতের নতুন প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ জারেদ।

♦ চেক প্রজাতন্ত্রের জেসেনকি পর্বতমালায় বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু স্কাই ব্রিজ ৭২১। দৈর্ঘ্য ৭২১ মিটার।

♦ ফিনল্যান্ডের সাথে রাশিয়ার ১৩০০ কি.মি. এর সীমান্ত রয়েছে।

♦ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। গৌতম বুদ্ধের শুভ জন্মদিন, বোধিজ্ঞান, মহাপরিনির্বাণলাভ- এই তিন স্মৃতিবিজরিত বৈশাখী পূর্ণিমা বিশ্বের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে বুদ্ধপূর্ণিমা নামে পরিচিত।

১৬.০৫.২০২২

♦ নিরপেক্ষ নীতি বদলে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন এর ন্যাটোতে যোগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান।

১৭.০৫.২০২২

♦ শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন টেম্পল ট্রিজ।

♦ ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ।

১৮.০৫.২০২২

♦ ভারতের আর্থিক গোয়েন্দাসংস্থা ‘এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট’।

♦ ন্যাটোর সদর দপ্তর-ব্রাসেলস, বেলজিয়াম।

♦ আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং গত তিন দশকের মধ্যে প্রথম নারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন এলিজাবেথ বোর্ন।

♦ টেসলার প্রধান নির্বাহী ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।

♦ কিউবার নাগরিকদের ভিসা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে যুক্তরাষ্ট্র।

♦ কিউবার রাজধানী হাভানা।

♦ ইউক্রেনের বন্দরনগর মারিউপোল।

♦ ৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠেছে।     

১৯.০৫.২০২২

♦ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার সংকট মোকাবেলায় আগের ঘোষিত তহবিলের সঙ্গে আরও ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

২১.০৫.২০২২

♦ মাস্কিপক্স হলো একটি ভাইরাস, যা পশু থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭০ সালে জায়ারে। ২০০৩ সালে আফ্রিকার বাহিরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই রোগ শনাক্ত হয়।

♦ RECP এর সদস্য দেশ ১৫টি। গঠিত হয় ১৫ নভেম্বর, ২০২০ সালে।

♦ আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ককেশাস অঞ্চল।       

২২.০৫.২০২২

♦ UNHCR-এর সদরদপ্তর জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।

♦ রাশিয়ার বৃহত্তম গ্যাস কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’।

♦ ফিনপ্রেসো ডট কোর তথ্যানুসারে, মে, ২০২১ থেকে মে, ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মুদ্রার দরপতন হয়েছে ৩.৩৫%।

♦ দ্য ব্যালান্স ডট কমের তথ্যানুসারে বিশ্বের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ এখনো মার্কিন ডলারে হয়ে থাকে।

♦ ইউক্রেনের ‘দনবাস’ অঞ্চল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া।

♦ ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় রাশিয়া।

♦ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ ৯৬৩ জন আমেরিকানের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাশিয়া।

♦ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী-অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

♦ USA-এর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘CIA’-এর প্রধান উইলিয়াম বার্নস।

♦ অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। নির্বাচিত হলে আলবানিজ হবেন দেশটির ইতিহাসে ননঅ্যাংলো-কেল্টিক পটভূমির প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

♦ ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’(এফবিআই) মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

২৩.০৫.২০২২

♦ বিশ্বের ১৪টি দেশে ছড়িয়েছে মাঙ্কিপক্স।

♦ তিন মাসের রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ৬০ লাখের বেশি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে।

♦ স্কট মরিসনকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্থনি আলবানিজ।

২৪.০৫.২০২২

♦ চীনের নেতৃত্বে বাণিজ্য জোট RCEP কে টেক্কা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের IPEF চুক্তির কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

♦ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে ইতালির পক্ষ থেকে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব।

২৫.০৫.২০২২

♦ আফগানিস্তানের বিমানবন্দরগুলো পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে তালেবান সরকার।

♦ গতকাল জাপানের রাজধানী টোকিওতে কৌশলগত নিরাপত্তা জোট কোয়াড সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

২৬.০৫.২০২২

♦ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মাঙ্কিপক্স ভাইরাসে একজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

♦ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’(পিটিআই)।

♦ ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ।

২৯.০৫.২০২২

♦ বিশ্বশান্তিরক্ষী দিবস।

♦ জাপানের বিদ্রোহী বামগোষ্ঠী রেড আর্মির সহপ্রতিষ্ঠাতা ফুসাকো শিজেনেবু।

♦ মেক্সিকোর ইয়াকাতান উপদ্বীপে মায়া সভ্যতার শহর “জিওল” আবিষ্কার। শহরটি ৯০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বের।

♦ ভারতের আসামের গুয়াহাটিতে আন্তর্জাতিক নদীবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত।

♦ লিভারপুলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের ১৪তম শিরোপা জয়।

৩০.০৫.২০২২

♦ ভারতের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র।

♦ ইসরায়েলের পার্লামেন্টের নাম নেসেট।

 

আলোচিত বাংলাদেশ

পরাক্রমশালী সামরিক জোট ন্যাটো

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক জোট North Atlantic Treaty Organization (NATO)। এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের কিছু দেশ NATO তে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে পুরো ইউরোপজুড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জেনে নিন ন্যাটোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

গঠন ও উদ্দেশ্য

৪ এপ্রিল ১৯৪৯ ইউরোপের ১০টি দেশ (বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল ও যুক্তরাজ্য) এবং উত্তর আমেরিকার ২টি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা) মিলে গঠিত হয় ন্যাটো। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন ও পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহের স্বাধীনতার অখণ্ডতা বজায় রাখাই ছিল এ জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপের আটটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিয়ে ১৪ মে ১৯৫৫ গঠিত হয় আরেকটি সামরিক জোট Warshaw Treaty Organization ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সোভিয়েত বলয়ভুক্ত সামরিক জোটটি ১ জুলাই ১৯৯১ ভেঙে যায়। কিন্তু এর বিপরীত ন্যাটো জোট অক্ষুণ্ণই শুধু থাকেনি, আরও সম্প্রসারিত এবং শক্তিশালী হয়েছে। পোল্যান্ডের ওয়ারশ-এ বসে বর্তমান রাশিয়ার নেতৃত্বে যে সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাক্ট করা হয় সেই পোল্যান্ডই এখন ন্যাটোর সদস্য। রাশিয়া ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে, নেওয়া হয়নি। অথচ পূর্বের সোভিয়েত বলয়ের এবং ওয়ারশ তে ছিল এমন অনেক দেশকে ন্যাটোর সদস্য করা হয়। মূলত এখান থেকেই ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার বিরোধিতা শুরু। ১২টি সদস্য দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ন্যাটোর বর্তমান সদস্য দেশ ৩০টি। ২৭ মার্চ ২০২০ উত্তর মেসিডোনিয়া NATO’র ৩০তম সদস্যপদ লাভ করে।

ন্যাটোর কার্যক্রম

ন্যাটো প্রধানত ৪টি কাজ করে থাকে, এগুলো হলো-

সিদ্ধান্ত এবং পরামর্শ : প্রতিদিনই সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর সকল স্তরে এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে গৃহীত সিদ্ধান্তকে বলা হয় ন্যাটো সিদ্ধান্ত। সদর দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গে দেশগুলোর জাতীয় প্রতিনিধিদল এবং কর্মীদের সহযোগিতায়, শত শত কর্মকর্তা, বেসামরিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন তথ্য বিনিময় করেন যা, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সাহায্য করে।

অপারেশন এবং মিশন : বেসামরিক জরুরি অপারেশনসহ সংকট ব্যবস্থাপনা এবং মিশনে বিস্তৃত পরিসরে সক্রিয় ভূমিকা নেয় ন্যাটো। এর উদাহরণ- আফগানিস্তান, কসোভো, ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা এবং আফ্রিকান ইউনিয়নে সহযোগিতার ক্ষেত্রে।

হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা (শক্তি) বৃদ্ধিকরণ : সদস্যদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষাসহ নীতি, ক্ষমতা এবং কাঠামো, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের হুমকি মোকাবিলা নিশ্চিত করার জন্য ন্যাটো বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল উদ্ভাবন করে এবং এগুলোকে প্রয়োগ সংক্রান্ত কর্মযজ্ঞের সাথে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই নিয়োজিত।

অংশীদারত্ব : সদস্য নয় এমন দেশের সাথে ন্যাটোর অংশীদারত্বের সম্পর্ক রয়েছে। এর মাধ্যমে বিস্তৃত পরিসরে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে এটি কাজ করে। এ দেশগুলো ন্যাটোর সাথে বিভিন্ন সংলাপে অংশ নেয়, এছাড়া জোটের সদস্যদের সাথে মাঠপর্যায়েও কাজ করে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদেশগুলোর কার্যত কোনো ভূমিকা নেই। ন্যাটো অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথেও বিস্তৃত পরিসরে সহযোগিতামূলক কাজ করে। বর্তমানে ১৯টি দেশের সাথে শান্তির জন্য অংশীদারত্ব (Partnership for Peace-PfP) কর্মসূচি রয়েছে ন্যাটোর। দেশগুলো- আর্মেনিয়া, অস্ট্রিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, ফিনল্যান্ড, জর্জিয়া, আয়ারল্যান্ড, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, মাল্টা, মলদোভা, সার্বিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ইউক্রেন ও উজবেকিস্তান।

ন্যাটোর সদস্যপদ হওয়ার শর্ত

ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া পূর্বনির্ধারিত নয়, পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বর্তমানে যেকোনো ইউরোপীয় দেশের জন্য সদস্যপদ গ্রহণ উন্মুক্ত রয়েছে যদি সে দেশগুলো নিরাপত্তা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ন্যাটো নীতিমালার সাথে সম্মত থাকে। তবে প্রথম ধাপ হচ্ছে একটি রাষ্ট্রকে অবশ্যই ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে। তারপর ন্যাটো এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে। এরপর জোটের ১৯৯৫ সালের ‘স্টাডি অন এনলার্জমেন্টের’ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়াটির মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বাজার অর্থনীতি, সংখ্যালঘুদের সমান সুযোগ-সুবিধা, শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত মোকাবিলা এবং ন্যাটোর সামরিক কার্যক্রমে অবদান রাখার সক্ষমতা ও ইচ্ছা। ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি দেশ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পূরণ করেছে কি না তা আলোচনার শুরুতে মূল্যায়ন করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশগুলোকে প্রাথমিকভাবে মেম্বারশিপ অ্যাকশন প্ল্যানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি একটি প্রস্তুতিমূলক প্রোগ্রাম যেখানে একটি রাষ্ট্রকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। যাতে সদস্যপদ পাওয়ার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলার চাহিদা পূরণ করতে পারে। তবে ন্যাটোতে নতুন কোনো দেশ যোগদানের জন্য এর সদস্যভুক্ত সকল দেশের সমর্থন এবং তাদের পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

ন্যাটো সেনাবাহিনী

ন্যাটোর কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। জোটটি সদস্য দেশগুলো থেকে পাঠানো বাহিনীর ওপর নির্ভর করে থাকে। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব সেনাবাহিনীর শক্তিমত্তাই ন্যাটোর শক্তি। জোটের স্বার্থে প্রতিটি সদস্য তাদের প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে শক্তিশালী দল ন্যাটোতে পাঠায়। ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকে ন্যাটোতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটোর গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি দেশের GDP’র ২% প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। কিন্তু বেশিরভাগ সদস্য দেশ এ লক্ষ্য পূরণ করেনি। ন্যাটোর সাম্প্রতিক এক হিসাবে, ২০২১ সালে দশটি সদস্য রাষ্ট্র। ন্যাটোর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটে GDP’র ২% বরাদ্দ দেয়। দেশগুলো হলো- গ্রিস, যুক্তরাষ্ট্র, ক্রোয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া এবং ফ্রান্স।

সামরিক অভিযান

♦ ন্যাটো জোট গঠনের শর্ত ছিল, সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যরা মিলিতভাবে সেই দেশকে রক্ষা করবে। ন্যাটো পরিচালিত অভিযানসমূহ-

 কসোভো

♦ Operation Allied Force (২৪ মার্চ-১০ জুন ১৯৯৯)

♦  Kosovo Force (KFOR) (১২ জুন ১৯৯৯-বর্তমান)।

বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা

♦  Operation Maritime Monitor (১৬) জুলাই-২২ নভেম্বর ১৯৯২)।

♦  Operation Sky Monitor (১৬ অক্টোবর ১৯৯২-১২ এপ্রিল ১৯৯৩)।

♦  Operation Maritime Guard (২২ নভেম্বর ১৯৯২-১৯৯৩)।

♦  Operation Deny Flight (১৩ এপ্রিল ১৯৯৩-২০ ডিসেম্বর ১৯৯৫)।

♦  Operation Sharp Guard (১৫ জুন ১৯৯৩-২ অক্টোবর ১৯৯৬)।

♦  Operation Deliberate Force (৩০ আগস্ট-২০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫)।

♦  Operation Joint Endeavour (২০ ডিসেম্বর ১৯৯৫-২০ ডিসেম্বর ১৯৯৬)।

♦  Operation Joint Guard (২১ ডিসেম্বর ১৯৯৬–১৯ জুন ১৯৯৮)।

♦  Operation Joint Forge (২০ জুন ১৯৯৮-২ ডিসেম্বর ২০০৪)।

আফগানিস্তান

♦ International Security Assistance Force-ISAF (২০ ডিসেম্বর ২০০১-২৮ ডিসেম্বর ২০১৪)।

♦ Resolute Support Mission (১ জানুয়ারি ২০১৫-১২ জুলাই ২০২১)।

লিবিয়া

♦ Operation Unified Protector (২৭ মার্চ-৩১ অক্টোবর ২০১১)।

সম্প্রসারণের পথে ন্যাটো

১৫ মে ২০২২ ফিনল্যান্ড ও ১৬ মে ২০২২ সুইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোতে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের কারণেই মূলত দেশ দুটি ন্যাটোর ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন দুই শতকের বেশি সময় ধরে সামরিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার নীতি মেনে চলেছে। স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড ৯ মে ১৯৯৪ শান্তির জন্য অংশীদারত্ব কর্মসূচির অংশ হিসেবে ন্যাটোর অংশীদারত্বে যোগদান করে। ১ জানুয়ারি ১৯৯৫ তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করে। সর্বশেষ ১৮ মে ২০২২ দেশ দুটি ন্যাটোতে যোগদানের আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। জর্জিয়া, মলদোভা এবং ইউক্রেনও চাচ্ছে ন্যাটোতে যোগ দিতে।

ন্যাটো-রাশিয়া সম্পর্ক

২২ জুন ১৯৯৪ ন্যাটোর সাথে শান্তির জন্য অংশীদারত্ব কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিল রাশিয়া। ১৯৯৭ সালে ন্যাটো এবং রাশিয়া অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং অবিভক্ত মহাদেশ তৈরির পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালালে রাশিয়ার সাথে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম স্থগিত করে ন্যাটো। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে নেওয়ার পর ইউক্রেন ন্যাটোর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠে। কিন্তু রাশিয়া এর বিরোধিতা করে। রাশিয়া বিশ্বাস করে ন্যাটো তাদের বিরোধী গ্রুপ এবং তারা পূর্ব ইউরোপের দিকে তাদের সদস্য বাড়িয়ে রাশিয়ার উঠানে তাদের প্রতিরক্ষা বেষ্টনী সাজাতে চায়।

তথ্য-উপাত্তে ন্যাটো

পূর্ণরূপ : North Atlantic Treaty Organization

♦ প্রতিষ্ঠা : ৪ এপ্রিল : ১৯৪৯

♦ দাপ্তরিক ভাষা : দুইটি – ইংরেজি ও ফরাসি

♦ সংস্থার প্রধান : মহাসচিব

♦ মেয়াদকাল : ৪ বছর

♦ ন্যাটোভুক্ত মুসলিম দেশ : ২টি (আলবেনিয়া ও তুরস্ক)

♦ মহাদেশভিত্তিক ন্যাটোর বর্তমান সদস্য : এশিয়ার ১টি (তুরস্ক), উত্তর আমেরিকার ২টি (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা) এবং ইউরোপের ২৭টি।

♦  ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ২৭টি দেশের ২২টি দেশ ন্যাটোর সদস্য। সদস্য নয় ৫টি দেশ- অস্ট্রিয়া, সাইপ্রাস, ফিনল্যান্ড মাল্টা এবং সুইডেন।

সদর দপ্তর

প্রতিষ্ঠাকালীন সদর দপ্তর ও যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্থাপন করা হলেও ১৯৫২ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ অক্টোবর ১৯৬৭ সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে নিয়ে যাওয়া হয়।

মহাসচিব

♦  প্রথম মহাসচিব : জেনারেল হাসটিং লিওনেল ইসমে (যুক্তরাজ্য); ২৪ মার্চ ১৯৫২ ১৬ মে ১৯৫৭ • বর্তমান মহাসচিব : জেনস স্টলেনবার্গ (নরওয়ে); ১ অক্টোবর ২০১৪ বর্তমান। তিনি ন্যাটোর ১৫তম মহাসচিব।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

♦  বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য দেশসমূহ

♦  ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ : গ্রিস ও তুরস্ক।

♦  ৮ মে ১৯৫৫ : জার্মানি।

♦  ৩০ মে ১৯৮২ : স্পেন।

♦  ১২ মার্চ ১৯৯৯ : চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড।

♦  ২৯ মার্চ ২০০৪ : বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়া।

♦  ১ এপ্রিল ২০০৯ : আলবেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া।

♦  ৫ জুন ২০১৭ : মন্টিনিগ্রো।

♦  ২৭ মার্চ ২০২০ : উত্তর মেসিডোনিয়া।

কর্তৃত্ববাদী মুদ্রা ডলার

বিশ্ব বাণিজ্যের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় মার্কিন ডলারের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বৃহৎ আকারের জন্য এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে স্থায়ী মুদ্রাও মনে করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। ফলে। বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে ডলারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে টাকার মান।

ডলার

‘ডলার’ (Dollar) শব্দটির উৎপত্তি মধ্যযুগীয় ইউরোপে। ইউরোপের দেশগুলো দ্রুত অর্থ প্রদানের একটি আন্তর্জাতিক উপায় হিসেবে এর উৎপত্তি ঘটায় এবং প্রতিটি ইউরোপীয় জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা বান্ধব নাম দেয়। ইংল্যান্ড প্রথম এটাকে ‘ডালার’ বলতো এবং পরবর্তীতে এটি ‘ডলার’ শব্দে রূপান্তরিত হয়।

প্রতীক

ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেন অধিক মাত্রায় রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করে, যাকে তাদের ভাষায় Peso de Ocho বা সংক্ষেপে Peso বলা হতো, যার অর্থ আট খণ্ড। Peso চালু করার সময় ইউরোপে রূপার সরবরাহ কমতে শুরু করে। ফলে এ স্পেনীয় মুদ্রা পেসো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাথমিক মুদ্রায় পরিণত হয়। স্পেনীয় পেসোর আগে আরেকটি মুদ্রার বেশ সুখ্যাতি ছিল, যার নাম Joachimsthaler। সংক্ষেপে একে ডাকা হয় ‘খেলার’ নামে। আর এখান থেকেই আসে ‘ডলার’ শব্দটি। ব্যবসায়ীরা লেনদেনের হিসাব সহজভাবে লেখার জন্য পেসো শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করতে শুরু করে। এ জন্য P বর্ণের ওপরের দিকে S বর্ণ বসিয়ে একটি প্রতীক তৈরি করা হয়। একসময় প্রতীকটি বেশি ব্যবহারের ফলে P ও S মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে S বর্ণের সঙ্গে P বর্ণের শুধু উল্লম্ব রেখাটি টিকে থাকে। যা দেখতে বর্তমান ডলার প্রতীকের মতোই। ১৭৭০ সালে ডলারের প্রতীকটি প্রথমবারের মতো কোনো নথিতে লিপিবদ্ধ হয়। তখনো কিন্তু দেশটির নাম যুক্তরাষ্ট্র হয়নি।

ডলারের আধিপত্য বিস্তার

বহু বছর ধরে পৃথিবীতে স্বর্ণের মানের ওপর নির্ধারিত হতো অর্থনীতি ও লেনদেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম স্বর্ণের মাধ্যমে বিক্রি করায় বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৭০% স্বর্ণ চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইউরোপ তখন যুদ্ধবিদ্ধস্ত। যেহেতু তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল এবং স্বর্ণের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন ডলার স্থিতিশীল ছিল সেহেতু আর্থিক ব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে, এ নিয়ে ১-২২ জুলাই ১৯৪৪ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের শহর ব্রেটন উড্‌সে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী মিত্রশক্তির ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেয়। তীব্র মতানৈক্যের পর যে রূপরেখাটি চূড়ান্ত হয়, তার নাম ছিল। ব্রেটন উড্স ফাইনাল অ্যাক্ট। মূলত ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৬ মার্কিন ডলারের বিনিময় হারতেই সকল সদস্যদেশ তাদের প্রাথমিক পার ভ্যালু হিসেবে বেছে নেয়। ব্রেটন উড্‌সে অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ডলারকে ৪৪টি দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে রাখতে একমত হয়। সেই থেকে ডলারের আধিপত্য শুরু ৩৭তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। ১৫ আগস্ট ১৯৭১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ব্রেটন উড্‌সে ব্যবস্থা বাতিল করে দিলে নতুন সংকট তৈরি হয়। যে যার মতো করে বিনিময় ব্যবস্থা অনুসরণ করা শুরু করে, বিশ্ব যাত্রা শুরু করে ফ্লোটিং (Floating) বা ভাসমান বিনিময় হারের দিকে। মার্কিন ডলার স্বর্ণে রূপান্তরের ক্ষমতা বাতিল করার এ পদক্ষেপকে বলা হয় Gold Window বন্ধ করা, যাকে অনেকে Nixon Shock বলে থাকেন। বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এবং চাহিদা বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সাথে একটি চুক্তি করে। এ চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবকে বাধ্য করা হয় ডলারকে সার্বভৌম বিশ্বমুদ্রা হিসেবে মেনে নিতে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি বাদশাহকে গ্যারান্টি দেয় যে, যতদিন তারা পেট্রো ডলার চুক্তি মেনে চলবে ততদিন সৌদি রাজপরিবার ক্ষমতায় থাকবে। সৌদি বাদশাহদের ক্ষমতায় থাকতে আরও একটি শর্ত দেয়, তা হলো, OPEC ভুক্ত সকল দেশকে রাজি করানো যাতে ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রা বা স্বর্ণের বিনিময়ে তেল বিক্রি না করে।

গ্রিনব্যাক (Greenback)

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে জরুরি কাগজের মুদ্রা প্রচলন করা হয়। মুদ্রার পিছনে সবুজ রঙ মুদ্রিত হয় বলে তা গ্রিনব্যাক (Greenback) বা গ্রিন মানি (Green Money) নামে পরিচিতি লাভ করে। ১০ মার্চ ১৮৬২ প্রথম জরুরি কাগজের মুদ্রা ইস্যু করা হয়।

বিবিধ তথ্য

♦  ব্রিটিশ পাউন্ড তার আধিপত্য হারায় ১৯২০ সালে।

♦  মার্কিন ডলার ও পাউন্ডকে দুর্লভ মুদ্রা বলে।

♦  মুদ্রার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি কুয়েতি দিনার।

♦  বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বা ফ্লোটিং বিনিময় মুদ্রা নীতির প্রচলন করে ১৯৭৬ সালে।

♦  বাংলাদেশ মধ্যবর্তী মুদ্রা হিসেবে পাউন্ডের পরিবর্তে মার্কিন ডলারকে বেছে নেয় ১৯৮৩ সালে।

♦  বাংলাদেশি মুদ্রাকে চলতি হিসাবে রূপান্তরযোগ্য করা হয় ১৭ জুলাই ১৯৯৩।

♦  বাংলাদেশের মুদ্রা টাকাকে ফ্লোটিং (Floating) বা ভাসমান ঘোষণা করা হয় ২০০৩ সালে।

♦  বাংলাদেশে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাকার অবমূল্যায়ন হয় ১৭ মে ১৯৭৫।

♦  ১৯৭১ সালে প্রতি ১ ডলারের মান ছিল ৭.৩০ টাকা।

বিশ্ব দর্পণ

সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের নিরাপত্তা চুক্তি

১১ মে ২০২২ সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের সঙ্গে পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তিতে সম্মত হয় যুক্তরাজ্য। এ চুক্তির ফলে কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অপর পক্ষ তাদের সহায়তা করবে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে দেশ দুটি সফর করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। চুক্তিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাজ্য সংকটে পড়লে সহায়তায় এগিয়ে আসবে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড।

সিন ফেইনের ঐতিহাসিক জয়

৫ মে ২০২২ যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত উত্তর আয়ারল্যান্ডে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় সাবেক সশস্ত্র সংগঠন আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা হিসেবে কাজ করা জাতীয়তাবাদী দল সিন ফেইন। এত দিনের প্রাধান্য বিস্তারকারী দল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টিকে (DUP) আইরিশ জাতীয়তাবাদী দলটি দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছে। ১৯২১ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর থেকে প্রাদেশিক আইনসভায় ইউনিয়নবাদী (যুক্তরাজ্যের অনুগত) রাজনৈতিক দল সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে আসছে। এবারের নির্বাচনে আইনসভার ৯০ আসনের মধ্যে সিন ফেইন ২৭টি ও DUP ২৫টি আসন লাভ করে। সিন ফেইন উত্তর আয়ারল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য থেকে বের করে নিয়ে আবার রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সাথে যুক্ত করতে চায়। আয়ারল্যান্ড দ্বীপের উত্তরের ঐ অংশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের অংশ, যা সেখানকার জাতীয়তাবাদীরা মানতে চায় না।

দ্বিতীয় মেয়াদে ম্যাক্রো

৭ মে ২০২২ দ্বিতীয় মেয়াদে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ইমানুয়েল ম্যাক্রো। দেশটির প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদে শপথ নেন। ২৪ এপ্রিল ২০২২ দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে ইমানুয়েল ম্যাক্রো ৫৮.৬% এবং কট্টর ডানপন্থী মেরি লি পেন ৪১.৪% ভোট পান। এর আগে ১০ এপ্রিল ২০২২ অনুষ্ঠিত প্রথম দফার নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রয়োজন হয় ফ্রান্সে গত ২০ বছরের মধ্যে এ প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচিত হলেন। ইমানুয়েল ম্যাক্রো ১৪ মে ২০১৭ থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের পুরো নাম ইমানুয়েল জিন মিশেল ফ্রেডেরিক ম্যাক্রো।

ফ্রান্সের নারী প্রধানমন্ত্রী

১৬ মে ২০২২ ফ্রান্সের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী এলিজাবেথ বর্নি। ৬১ বছর বয়সি এলিজাবেথ বর্নি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্যাসটেক্সের স্থলাভিষিক্ত হন। এর আগে নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফ্রান্সে দায়িত্ব পালন করেন এডিথ ক্রেসন। তিনি ১৫ মে ১৯৯১-২ এপ্রিল ১৯৯২ পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

অস্ত্র পাঠাতে বিশ্বযুদ্ধের আইন চালু

জার্মানির নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্রদের অস্ত্র দিতে ১১ মার্চ ১৯৪১ যুক্তরাষ্ট্র Lend-Lease আইন কার্যকর করে। এখন ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে সেই আইনটি পুনরায় ফিরিয়ে আনে দেশটি। ৯ মে ২০২২ এ সংক্রান্ত আইনে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ আইনে স্বাক্ষর করার জন্য বাইডেন যে দিনটি বেছে নেন, সেটিও প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ৮ মে পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নাৎসিদের বিরুদ্ধে বিজয়ের দিন হিসেবে উদযাপন করে থাকে। ঠিক এর পরদিন ৯ মে ইউরোপ ডে হিসেবে পালন করা হয়। ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও ১৯৪০-এর দশকে জার্মানির নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র ছিল তারা। সেই সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রকে পাশ কাটাতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট Lend-Lease আইন পাস করেন। ইউরোপের মিত্রদের কাছে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করতে স্মরণীয় ঐ উদ্যোগ নেন রুজভেল্ট। এখন ইউক্রেনে ট্যাংক-বিধ্বংসী, উড়োজাহাজ-বিধ্বংসীসহ শক্তিশালী ও আধুনিক সব অস্ত্র পাঠাতে বাইডেন এ পদক্ষেপ নেন।

সংযুক্ত আর আমিরাতের নতুন প্রেসিডেন্ট

১৪ মে ২০২২ সংযুক্ত আর আমিরাতের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ মোহাম্মদ কি জায়েদ আল নাহিয়ান। দেশটি ফেডারেল সুপ্রিম কাউন্সিল তারে এ পদের জন্য নির্বাচিত করেন। এর আগে ১৩ মে ২০২২ তিনি আবুধাবির শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের মধ্য থেকে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

রহস্যময় শহরের নাম হুয়ানা পিচু’-

পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একটি ‘মাচু পিচু’। পেরুর আন্দিজ পর্বতের মাথার সুনিপুণভাবে তৈরি ইনকাদের এ শহর দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক পাড়ি দেন। যদিও মাচু পিচু আবিষ্কারের একশ’ বছর পর জানা যাচ্ছে, নামটাই ভুল। ইনকারা এ শহরকে ডাকতো ‘হুয়ানা পিচু’ নামে। ১৪২০ সাল নাগাদ ইনকাদের বাস ছিল। ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কুজকো। সেখানেই বাস করত রাজপরিবার। পরবর্তী সময়ে ইনকা সাম্রাজ্যের দখল নেয় স্প্যানিয়ার্ডরা। পরাজিত ইনকারা ক্রমশ হারিয়ে যায়। একা পড়ে থাকে তাদের হুয়ানা পিচু। ক্রমশ অজানার ভিড়ে হারিয়ে যায় এ শহরও। ১৯১১ সালে এ শহর আবিষ্কার করেন হিরাম বিংহাম। তিনিই নাম দেন ‘মাচু পিচু। বিংহামের গাইড ছিলেন মেলচোর আর্তেগা। পেশায় স্থানীয় চাষি। আর্তেগার কথার ভিত্তিতেই ঐ নাম রেখেছিলেন বিংহাম। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ্যার অধ্যাপক ব্রায়ান বাওয়ারের ধারণা, এখানেই ভুল হয়ে যায় বিংহামের। নতুন গবেষণায় কিছু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে, তাতে ধরা পড়েছে শহরের আসল নাম আলাদা। এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসবিদ ডোনাটো আমাডো গঞ্জালেস। তিনিও স্বাধীন ভাবে ‘মাচু পিচু” নিয়ে গবেষণা করেন। দু’জনের তথ্য মিলিয়ে দেখেন ঠিকই, এ শহরের নাম ‘হুয়ানা পিচু’। পেরুর আদি ভাষা ‘কেচুয়া’-তে হুয়ানা শব্দের অর্থ নতুন বা তরুণ। পিচু’র অর্থ পর্বতশৃঙ্গ। মাচু শব্দের অর্থ প্রাচীন। অর্থাৎ এ শহরকে এতদিন বলা হতো ‘প্রাচীন পর্বতশৃঙ্গ’। কিন্তু এটি আসলে নতুন পর্বতশৃঙ্গ।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব

বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে দুই বছরের ক্ষতি সামলে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই গতিকে পুনরায় মন্থর করে দিয়েছে।

সূচনা-প্রসঙ্গ

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়া। ইউক্রেন বাহিনীও গড়ে তুলে তাদের প্রতিরোধ। ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। তারা একযোগে রাশিয়ার ওপর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে থাকা রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করা হয়। রাশিয়াও তাদের ওপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইতোমধ্যে এসব নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি। বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যেকটি দেশ একে অপরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত। ফলে, যেকোনো ধরনের সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞা শুধু সেই দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য দেশের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

জ্বালানি ও ভোজ্যতেল সংকট

রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারক দেশ। তাই যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। যা এক পর্যায়ে ১৩৯.১৩ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১২৫ ডলারে এবং ২০২৩ সালে ১৫০ ডলারে উঠতে পারে। তেলের পাশাপাশি গ্যাসের দামও আকাশ ছুঁয়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৬২% পর্যন্ত বেড়েছে। ইউরোপের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার ৪৭% এবং জ্বালানি তেলের এক তৃতীয়াংশ রাশিয়া একাই সরবরাহ করে। রাশিয়া ছাড়াও নরওয়ে, আলজেরিয়া ও আজারবাইজান ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানি তার প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার ৬৫% রাশিয়া থেকে আমদানি করে। এছাড়া ইতালি তার মোট গ্যাসের চাহিদার ৪৩% এবং ফ্রান্স ১৬% রাশিয়া থেকে আমদানি করে। ইউরোপের অন্য অনেক দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার সিংহভাগই জোগান দেয় রাশিয়া। বলা যায়, রাশিয়ার জ্বালানি শক্তিই ইউরোপের বাড়িগুলোকে উষ্ণ রাখে, কারখানাগুলো সচল রাখে আর যানবাহনগুলোকে দেয় প্রয়োজনীয় জ্বালানি। এ অবস্থায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটও সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া।

বিশ্ববাজারে সয়াবিন সরবরাহকারী শীর্ষ ১০ দেশের দুটি ইউক্রেন ও রাশিয়া। যুদ্ধ শুরুর পর সয়াবিনের বিশ্ববাজারে প্রভাব পড়েছে। এদিকে গ্লোবাল এস অ্যান্ড পির তথ্যমতে, সূর্যমুখী তেলের বৈশ্বিক রপ্তানির ৪৬.৯% আসে ইউক্রেন থেকে ও ২৯.৯% রাশিয়া থেকে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে। (EU) সূর্যমুখী তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সূর্যমুখী তেল রপ্তানিতে দেশটি বিপাকে পড়েছে। ২৮ এপ্রিল ২০২২ ইন্দোনেশিয়াও পাম অয়েল রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে বিশ্বব্যাপী ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গম ও খাদ্যশস্যের দাম। কোনো কোনো দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার প্রতিবাদে চলছে আন্দোলন, বিক্ষোভ আন্দোলন ঠেকাতে কোথাও আবার জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা। সামনের দিনগুলোতে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই রেকর্ড বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বলেছে, যুদ্ধের কারণে এ বছর বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। খাদ্যের দাম বাড়লে অবধারিতভাবে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) প্রধান ডেভিড বিসলি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্যের দাম এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে, তা বিশ্বের দরিদ্র মানুষদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক। কিন্তু দেশটি সম্প্রতি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে এ ধাতুটির সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এছাড়াও সার, নিকেল ও প্যালাডিয়াম-এর অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। চলমান সংঘাতের কারণে পটাশের সরবরাহ বাধাগ্রস্থ হয়েছে অনেকাংশে, যা খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতে, জানুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক বেড়েছে ১.১%। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে সোনা, রুপা, তামাসহ মূল্যবান সব ধাতু, সিমেন্ট, পাথর, ইট, বিটুমিন, বিল্ডিং ফিনিশিং আইটেম ইত্যাদি দ্রব্যসহ প্রায় সব ধরনের নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রবন্ধ

খাদ্য ঘাটতি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বে খাদ্য সংঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ খাদ্যঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর অনেক মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী ভুয়া ও অপুষ্টি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্ববাজারের ২.৫% খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে থাকে। রাশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম বড় গম রপ্তানিকারক, এক্ষেত্রে ইউক্রেনের অবস্থান পঞ্চম। দেশ দুটি বিশ্বব্যাপী গম বাণিজ্যের প্রায় ৩০% সরবরাহ করে। মিসর তার গমের ৮০% এর বেশি এবং লেবানন ৫০% এর বেশি ইউক্রেন থেকে আমদানি করে। আফ্রিকার ৫৫টি দেশের মধ্যে ৩৫টিই রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গমসহ অন্য খাদ্যশস্য আমদানি করে। চলমান যুদ্ধের কারণে ২০২২-২৩ সালে ইউক্রেনে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে FAO। এছাড়া দেশটির ২০% থেকে ৩০% জমি অনাবাদি থাকবে। যুদ্ধের ফলে গম ও ভুট্টার মতো বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে আছে সারের সংকট। সার উৎপাদনে ঘাটতির কারণে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। আর এর ফলে বিশ্বে বিরাট খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। WTO’র মহাপরিচালক বলেন, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকট দেখা দিয়েছিল, যুদ্ধের কারণে তা চলমান থাকবে।

 প্রবৃদ্ধি হ্রাস

 IMF’র তথ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবন্ধি 8.8% কম হবে। IMF, বিশ্ব ব্যাংক এবং ইউরোপীয় ব্যাংক এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, এ যুদ্ধের প্রভাব পড়বে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতেই। প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যাবে, বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণরা। এদিকে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)। এর আগে সংস্থাটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৪.৭% প্রবৃদ্ধির কথা বললেও এবার তা কমিয়ে ২.৫% তে নামিয়ে এনেছে। এছাড়াও WTO’র মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো ইওয়েলা বলেন, মধ্যম মেয়াদে বিশ্বে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকবে। ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (EBRD)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, যুদ্ধ যদি আজকে থেমে যায়, তারপরেও আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত এর প্রভাব রয়ে যাবে। আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্য দিয়েই সে প্রভাব অনুভব করবে বিশ্ব।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব

 রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে। এর প্রভাবে দেশে পরিবহন ভাড়া ও কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতি বছর ৫০ লাখ টন ডিজেল, ১৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েল ও ১ লাখ ২০ হাজার টন অকটেন আমদানি করে। ৯ বছরের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠায় প্রতিদিন জ্বালানি তেল বাবদ সরকারকে ১৫ কোটি ডলার লোকসান দিতে হচ্ছে। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়ারও আশঙ্কা আছে।

বাংলাদেশ অনেক পণ্যই রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গম, সূর্যমুখী তেল, ভুট্টা, তুলা, সরিষা, মসুর ডাল, জ্বালানি তেল, গ্যাস ইত্যাদি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য এবং রাশিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পণ্য। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংককে বৈশ্বিক আন্তঃব্যাংক লেনদেনসংক্রান্ত সুইফট সিস্টেমে নিষিদ্ধ করার ফলে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি হুমকির মধ্যে পড়েছে। ফলে যেসব পোশাকের অর্ডার শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তার মূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। পণ্য আমদানির বেশির ভাগই সিঅ্যান্ডএফ (কস্ট অ্যান্ড ফ্রেইট) ভিত্তিতে হয়। ফলে পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়ার কারণে আমদানিকারকদের খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে আমদানিকৃত পণ্যমূল্যে। আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়াবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাণিজ্য ঘাটতি ১,৫৬১ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৮৭ কোটি ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ বেড়ে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন ঘটছে যা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকতে পারে। এক বছরে ডলারের দর বেড়েছে ১৬%। এ অবস্থায় দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্ববাজারে গম রপ্তানির বড় অংশীদার রাশিয়া ও ইউক্রেন। চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে চার লাখ টন গম আমদানি করেছে। আরও দেড় থেকে দুই লাখ টন গম আমদানির টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশে গম আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠে ভারত। দেশটি ১৩ এপ্রিল ২০২২ গম রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। এতে বাংলাদেশের বাজারে গমের দাম বেড়ে গেছে। এই যুদ্ধের কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২সহ যেসব প্রকল্পে রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়তে পারে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ধাক্কা যা এখনো মহামারির প্রভাব থেকে বিশ্ব পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং এক দেশ অপর দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানার্থে এ যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।

Leave a Reply